রাশিয়ার সম্ভাব্য ‘হাইব্রিড হামলা’ নিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে উদ্বেগ বাড়ছে। ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পাশাপাশি নাশকতা, সাইবার হামলা এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে কর্মকাণ্ডের আশঙ্কায় কয়েকটি দেশ নিরাপত্তা ও বেসামরিক প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি জোরদার করছে।
পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক ১৭ সেপ্টেম্বর সতর্ক করে বলেন, গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী ইউক্রেনকে সমর্থনকারী দেশগুলোর বিরুদ্ধে রাশিয়া ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ‘হাইব্রিড হামলা’ চালানোর পরিকল্পনা করতে পারে। তাঁর ভাষ্য, এমন হামলাকে ‘দুর্ঘটনা’ হিসেবে উপস্থাপন করে ন্যাটোর সদস্যদের মধ্যে সম্মিলিত প্রতিক্রিয়ার ইচ্ছা দুর্বল করার চেষ্টা হতে পারে।
পোল্যান্ডের পর লিথুয়ানিয়াও একই ধরনের আশঙ্কার কথা জানিয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী কেস্তুতিস বুদরিস বলেন, পোল্যান্ডসহ মিত্র দেশগুলোর মতো লিথুয়ানিয়ার কাছেও এ বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে। সম্ভাব্য ‘ফলস-ফ্ল্যাগ’ অভিযান নিয়েও মিত্র দেশগুলোর মধ্যে আলোচনা হয়েছে বলে তিনি জানান।
নেপথ্যে ‘হাইব্রিড যুদ্ধ’
‘হাইব্রিড যুদ্ধ’ বলতে সাধারণত প্রচলিত সামরিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি সাইবার হামলা, নাশকতা, ড্রোন হামলা, তথ্যযুদ্ধ এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর চাপ সৃষ্টির মতো কর্মকাণ্ডকে বোঝানো হয়।
ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটে এর আগে বলেছেন, ইউরোপীয় মিত্রদের আকাশসীমায় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রবেশের পাশাপাশি ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর ভূখণ্ডে ক্ষতিকর কর্মকাণ্ড বেড়েছে। জার্মানির লাইপজিগে কথিত রুশ ‘হাইব্রিড হামলার’ বিষয়টিও তিনি উল্লেখ করেছেন।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁও ইউরোপের বিরুদ্ধে রাশিয়ার হাইব্রিড হুমকি বাড়ার কথা বলেছেন। এ পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও প্রতিরক্ষা শিল্পের সংবেদনশীল স্থাপনাগুলোকে ড্রোন ও সাইবার হামলা থেকে সুরক্ষায় অতিরিক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার স্টাব সম্ভাব্য নাশকতা ও ড্রোন হামলার বিষয়ে জনগণকে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে আতঙ্কিত না হয়ে শান্ত থাকার পরামর্শও দিয়েছেন তিনি।
শুধু ন্যাটো নয়, প্রস্তুতি নিচ্ছে ইউরোপ
সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় ইউরোপের বিভিন্ন দেশ বেসামরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও জোরদার করছে। জার্মানি যুদ্ধ বা ব্যাপক হতাহতের পরিস্থিতিতে হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা পর্যালোচনা করছে। লিথুয়ানিয়া সামরিক জরুরি অবস্থা বা বড় ধরনের সংকটে জনগণকে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনাও প্রস্তুত করেছে।
ন্যাটো সদস্য না হয়েও সুইজারল্যান্ড নতুন নিরাপত্তা কৌশলে ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ, হাইব্রিড হুমকি এবং গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ ও অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীলতাকে বড় নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। দেশটি বেসামরিক নাগরিক ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর সুরক্ষা এবং ড্রোন বা দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে।
ন্যাটোও বেসামরিক স্থিতিস্থাপকতার ওপর গুরুত্ব বাড়িয়েছে। জোটের নির্দেশনায় সংকট বা সংঘাতের সময় বিদ্যুৎ, পানি, যোগাযোগ, খাদ্য সরবরাহ ও স্বাস্থ্যসেবার মতো জরুরি পরিষেবা সচল রাখার সক্ষমতা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।
ন্যাটোর আশঙ্কা কতটা?
ন্যাটো এখনো বলেনি যে রাশিয়া কোনো সদস্য দেশে সরাসরি সামরিক হামলা চালাতে যাচ্ছে বা এমন হামলা আসন্ন। তবে জোটের মহাসচিব রাশিয়ার কর্মকাণ্ডকে ক্রমেই বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বলে বর্ণনা করেছেন এবং ইউরোপীয় ভূখণ্ডে ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্যান্য ক্ষতিকর কর্মকাণ্ডের ঝুঁকির কথা বলেছেন।
ফলে ইউরোপীয় দেশগুলোর প্রস্তুতির মূল লক্ষ্য এখন দুটি—সম্ভাব্য হামলা বা নাশকতা প্রতিরোধে প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ানো এবং কোনো সংকট তৈরি হলে বিদ্যুৎ, পানি, যোগাযোগ, খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবার মতো জরুরি পরিষেবা সচল রাখা।
অর্থাৎ, রাশিয়ার পক্ষ থেকে ইউরোপে বড় ধরনের সরাসরি হামলা আসন্ন—এমন কোনো ন্যাটো ঘোষণা নেই। তবে ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ড্রোন, সাইবার হামলা, নাশকতা ও অন্যান্য ‘হাইব্রিড’ কর্মকাণ্ড নিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলোর উদ্বেগ যে বেড়েছে, সাম্প্রতিক সতর্কতা ও প্রস্তুতিতেই তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক